ফ্যামিলি কার্ডের নীতিমালা চূড়ান্ত, সুবিধা পাবে না যারা
পরিবারের কেউ সরকারের পেনশনভোগী থাকলে সে পরিবার ‘ফ্যামিলি কার্ড’ পাবে না। তেমনি বাড়িতে এসি ব্যবহারকারী বা গাড়িসহ বিলাসবহুল সম্পদের মালিকও এ সুবিধা পাচ্ছেন না। নিম্ন, মধ্যম ও উচ্চ আয়ের মধ্যে ছয় শ্রেণির মানুষকে সুবিধার বাইরে রেখে সরকারের ‘ফ্যামিলি কার্ড নীতিমালা’ চূড়ান্ত করা হয়েছে। আরও যারা কার্ডের সুবিধা পাচ্ছেন না, তারা হলেন-পরিবারের কোনো সদস্য সরকারি চাকরিজীবী থাকলে এবং বাণিজ্যিক লাইসেন্সের মালিক বা বড় ব্যবসা থাকলেও এ কার্ড পাওয়ার অযোগ্য হবেন।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় ‘ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বাস্তবায়ন গাইডলাইন-২০২৬’ নামে এ নীতিমালা করেছে। এ কর্মসূচির মূল দর্শন হচ্ছে-‘ব্যক্তি নয়, পরিবারই উন্নয়নের মূল একক’। নীতিমালাটি খুব শিগগিরই প্রজ্ঞাপন আকারে জারি করা হবে। এদিকে, আগামী ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন প্রধানমন্ত্রী।
সূত্র মতে, নীতিমালায় কার্ড পাওয়ার ক্ষেত্রে সাত ব্যক্তি-শ্রেণির মানুষকে অগ্রাধিকার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা আছে-ভূমিহীন ও গৃহহীন, প্রতিবন্ধী সদস্যের পরিবার এ কার্ড পাবেন। এছাড়া অনগ্রসর জনগোষ্ঠী- হিজড়া, বেদে ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর পরিবার এবং দশমিক ৫ একর বা এর কম জমির মালিকও পাবেন এ কার্ড।
প্রসঙ্গত, বিএনপি সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারে ঘোষণা ছিল দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়া হবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দায়িত্ব নেওয়ার পর মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটির কার্যপরিধির মধ্যে কার্ড বিতরণের নীতিমালা প্রণয়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়। ফলে দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আলোকে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় এ নীতিমালাটি তৈরি করেছে। মঙ্গলবার এ নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে বৈঠকে ফ্যামিলি কার্ড পাইলটিং বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। অবশ্য বৈঠক শেষে সমাজকল্যাণমন্ত্রী আবু জাফর মোহাম্মদ জাহিদ হোসেন সাংবাদিকদের জানান, আগামী ১০ মার্চ ফ্যামিলি কার্ড বিতরণের পরীক্ষামূলক কার্যক্রম প্রধানমন্ত্রী উদ্বোধন করবেন। ওই দিন একযোগে ১৪টি উপজেলায় এ কর্মসূচির সূচনা করা হবে এবং তা ধারাবাহিকভাবে চলবে। আশা করছি এই পাইলট কর্মসূচি আগামী চার মাসের মধ্যে শেষ হবে। পরবর্তীতে পর্যায়ক্রমে প্রতিটি উপজেলা এর আওতায় আসবে।
সূত্র মতে, নীতিমালায় কার্ডের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা ঠিক করা হয়েছে। প্রাথমিকভাবে ১৪টি উপজেলায় প্রত্যেকটিতে একটি ইউনিয়নের একটি ওয়ার্ডের হতদরিদ্র, দরিদ্র ও নিম্নবিত্ত নারীরা এ কার্ড পাবেন। এ কার্ডের আওতায় প্রত্যেক পরিবারকে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে দেওয়া হবে। প্রাথমিকভাবে দেশের ৬ হাজার ৫০০ দরিদ্র পরিবারকে কার্ড দেওয়া হবে এবং পর্যায়ক্রমে ২ কোটি দরিদ্র পরিবারকে এ সুবিধার আওতায় আনা হবে। এছাড়া এই কর্মসূচি চালু হলে সব নগদ ভাতা ও টিসিবির সহায়তা এক কার্ডের অধীনে চলে আসবে।
জানতে চাইলে সাবেক সিনিয়র অর্থসচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, এ কর্মসূচি পরিচালনার জন্য চলতি বাজেট থেকে অর্থ বরাদ্দ করা হবে। কিন্তু কোনোভাবে টাকা ছাপিয়ে এ ধরনের কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা সঠিক হবে না। কারণ এতে মূল্যস্ফীতি আরেক দফা বেড়ে যাবে। সীমিত পরিসরে এ কর্মসূচি চালু হচ্ছে এটিও ঠিক আছে। তবে দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে কিন্তু পরিবারের ছেলেমেয়ে স্কুলে যাচ্ছে, সে পরিবারকেও অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। এদিকে নীতিমালায় উল্লেখ করা হয়, দেশে ৯৫টিরও বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চলছে। কিন্তু এর মধ্যে সমন্বয়হীনতা, একই ব্যক্তির একাধিক সুবিধা গ্রহণ এবং প্রায় ২২-২৫ শতাংশ প্রকৃত দরিদ্ররা বাদ পড়ছেন। এসব সমস্যা দূর করে একটি বৈষম্যহীন ও মানবিক কল্যাণ রাষ্ট্র গড়ে তোলাই এই প্রকল্পের লক্ষ্য। এই কর্মসূচির দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প হলো ২০৩০ সালের মধ্যে ফ্যামিলি কার্ডকে প্রতিটি নাগরিকের জন্য একটি ‘সর্বজনীন সোশ্যাল আইডি কার্ড’-এ রূপান্তর করা।
গ্রামীণ এলাকায় বসতভিটাসহ আবাদি জমির পরিমাণ ০.৫০ একর বা তার কম হওয়া এবং পরিবারের মাসিক আয় ও সম্পদের ভিত্তিতে এই যোগ্যতা নির্ধারিত হবে। নারীর ক্ষমতায়ন নিশ্চিত করতে এই ভাতাটি সরাসরি পরিবারের ‘মা’ বা ‘নারী প্রধান’ সদস্যের নামে ইস্যু করা হবে।
সরকারি কোষাগার থেকে এই অর্থ সরাসরি সুবিধাভোগী নারীর মোবাইল ওয়ালেট বা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা হবে। এর পাশাপাশি বিদ্যমান টিসিবি কার্ডকে ফ্যামিলি কার্ডের ‘ডাইনামিক সোশ্যাল রেজিস্ট্রি’ হিসাবে স্থানান্তরিত করা হবে। একই স্মার্ট কার্ড ব্যবহার করে ওটিপি ভেরিফিকেশনের মাধ্যমে সাশ্রয়ী মূল্যে খাদ্য সহায়তা এবং ভবিষ্যতে শিক্ষা উপবৃত্তি ও কৃষি ভর্তুকির মতো সুবিধাগুলোও পাওয়া যাবে। ২০২৮ সালের মধ্যে দেশের সামাজিক নিরাপত্তা বাজেটকে জিডিপির ৩ শতাংশে উন্নীত করার একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা এই গাইডলাইনে নির্ধারণ করা হয়েছে।
সূত্র আরও জানায়, পাইলট প্রকল্পের আওতায় ফ্যামিলি কার্ডের জন্য দেশের ১৩টি ভিন্নধর্মী এলাকা নির্বাচন করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ঢাকার বনানী কড়াইল বস্তি (শহরে বস্তি), চট্টগ্রামের পটিয়া (শিল্প এলাকা), বান্দরবানের লামা (পার্বত্য এলাকা), সুনামগঞ্জের দিরাই (হাওর এলাকা) এবং ঠাকুরগাঁও সদরের (সীমান্তবর্তী এলাকা) মতো বৈচিত্র্যময় অঞ্চল অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এলাকা নির্বাচনের ক্ষেত্রে দারিদ্র্যের ঘনত্ব, ভৌগোলিক চ্যালেঞ্জ এবং অনগ্রসরতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।
এই পাইলটিং প্রকল্পের জন্য মোট ২ কোটি ১১ লাখ টাকা বরাদ্দ করা হয়েছে। যার ৭৭ শতাংশ অর্থ সরাসরি দরিদ্র পরিবারগুলোর হাতে পৌঁছাবে। এটি বাংলাদেশের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক মুক্তির একটি ঐতিহাসিক সনদ হিসাবে বিবেচিত হবে, যা প্রতিটি নাগরিকের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করবে।
ফ্যামিলি কার্ডের অর্থায়ন প্রসঙ্গে অর্থ বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা বলেন, এ কর্মসূচি বাস্তবায়নে যে অর্থের প্রয়োজন হবে, সেটি চলতি অর্থবছরের বাজেটের অপ্রত্যাশিত খাত এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের বাজেট থেকে দেওয়া হবে। অবশ্য চার হাজার কোটি টাকার থোক বরাদ্দ আছে অপ্রত্যাশিত খাতে। ফলে অর্থ নিয়ে কোনো সমস্যা হবে না।
এদিকে কার্ডের সুবিধাভোগী নারী নির্বাচনে সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। নির্বাচনের প্রক্রিয়া হিসাবে সরকারের খানা জরিপ এবং সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় থেকে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ডাটাবেজ ব্যবহার করা হবে। সেখান থেকে প্রকৃত এবং উপযুক্ত সুবিধাভোগীকে শনাক্ত এবং এনআইডি কার্ডের মাধ্যমে উপযুক্ত ব্যক্তিকে তালিকাভুক্ত করা হবে।